“চিত্রালয়” থেকে চলচ্চিত্রে (৫)
Created: Apr 30, 2026
“চিত্রালয়” থেকে চলচ্চিত্রে (৫)
চলচ্চিত্রের ডাল (সিনেমার ডাল খাইনি… তবুও কেন ছাড়তে পারিনি)
২ মে, ১৯৯৪ সাল। আমার জীবনের এক নতুন দরজা খুলে যাওয়ার দিন।
এফডিসির ৮ নম্বর ফ্লোর। বিশাল একটা ড্রয়িংরুমের সেট বানানো হয়েছে—দেয়ালে সাজানো ছবি, ভারী পর্দা, সোফা, লাইটের তাপ আর চারপাশে ব্যস্ত মানুষ। সবাই যার যার কাজে নিমগ্ন। সেদিন প্রথমবার এত কাছ থেকে সিনেমার ভেতরের কার্যকলাপ দেখছি।
শুটিংয়ে শিল্পী হিসেবে ছিলেন হিরো আলমগীর, ভিলেন খলিল এবং অভিনেত্রী খালেদা আক্তার কল্পনা। তাদের অভিনয়, ক্যামেরার মুভমেন্ট, লাইটের খেলা—সবকিছু আমার কাছে নতুন, আকর্ষণীয় মনে হচ্ছিল। ডিরেক্টরের ডিক্টেরশিপ আমাকে অভিভূত করেছিলো, আমাকে ডাকছিলো । সেদিন মনে হয়েছিলো আমি যেন অন্য এক জগতে ঢুকে পড়েছি।
সেদিন থেকেই শুরু হয় আমার চলচ্চিত্র জীবনের ট্রেনযাত্রা।
পরিচালক দেলোয়ার জাহান ঝন্টু—আমার মামা। তার হাত ধরেই সেটে উপস্থিত আমি, একজন সহকারী পরিচালক হিসেবে। কিন্তু সত্যি বলতে, আমার দায়িত্ব কী—সে বিষয়ে আমার মাথায় কোনো পরিষ্কার ধারণাই ছিল না। আমি শুধু মুগ্ধ দর্শকের মতো শুটিং দেখছিলাম।
একটা শট শেষ হতেই সিনিয়র সহকারী পরিচালক আমাকে বললেন,
“শ্লেট দাও।”
শ্লেটটা আমার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু কীভাবে দিতে হয়, কী বলতে হয়—আমি কিছুই জানি না।
তিনি দ্রুত কিছু লিখে দিয়ে বললেন,
“ক্যামেরার সামনে ধরো।”
আমি ঠিক তাই করলাম।
ক্যামেরার পেছন থেকে চিত্রগ্রাহক জাকির হোসেন বললেন,( গুনি এই চিত্রগ্রাহক কে নিয়ে আলাদা করে লিখবো।)
“গ্লেয়ার!”
আমি স্থির। কিছুই বুঝলাম না।
তিনি আবার বললেন,
“গ্লেয়ার!”
তবুও আমি নির্বাক। মাথার ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন—গ্লেয়ার মানে কী?
ঠিক তখনই পরিচালক ঝন্টু মামা এগিয়ে এলেন। আমার হাত থেকে শ্লেটটা নিয়ে নিজেই ধরলেন। মুহূর্তেই কাজ শেষ।
তারপর হালকা হাসি দিয়ে বললেন,
“তোর আর শ্লেট দিতে হবে না।”
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
একটা ছোট ভুল, কিন্তু আমার কাছে সেটা ছিল বিশাল অস্বস্তির মুহূর্ত।
পরে বুঝেছি—এত বড় ভুল করার পরও কেউ কিছু বলেনি, শুধু একটাই কারণে—আমি পরিচালকের ভাগ্নে।
মামার জোরে সিনেমায় টিকে গেলাম—এই সত্যটা তখনই উপলব্ধি করি।
আজকের ডিজিটাল যুগে শ্লেটের গুরুত্ব অনেকটাই কমে গেছে। কিন্তু তখন শ্লেট ছিল শুটিংয়ের অপরিহার্য অংশ। শ্লেট বা ক্ল্যাপস্টিকে লেখা থাকত দৃশ্য নম্বর, শট নম্বর, টেক নম্বর। ক্যামেরার সামনে সেটা ধরার মাধ্যমে প্রতিটি শট চিহ্নিত করা হতো, যাতে পরে এডিট টেবিলে বোঝা যায় কোনটা ‘ওকে’ শট, এবং কোন শটটি কোন দৃশ্যের।
আর “গ্লেয়ার” মানে আলোর প্রতিফলন। সরাসরি আলো পড়লে মানুষ যেমন চোখে কিছু দেখা যায় না, তেমনি ক্যামেরাও দেখেনা। তাই শ্লেট ধরারও একটা নির্দিষ্ট কৌশল আছে— যাতে গ্লেয়ার না থাকে সেভাবে ধরতে হয় যা আমি তখন জানতাম না। আজকের ডিজিটাল যুগের চলচ্চিত্র পরিচালক বা সহকারীগন এই গ্লেয়ার চানবেইনা।
সহকারী পরিচালকের প্রধান কাজগুলোর একটি ছিল এই শ্লেট দেওয়া।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো—কায়দাটা পরে শিখে ফেললেও, আর কোনোদিন শ্লেট ধরার সুযোগ হয়নি।
মামার জোর—কথাটা তখন সত্যি মনে হয়েছিল।
দুপুর পর্যন্ত শুটিং চলল। লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশনের মাঝে সময় কখন কেটে গেল বুঝতেই পারিনি। কারন আমি একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। যখন দুপুড়ের খাবারের ব্রেক দিলো তখন দেখি ঘামে আমার সারা শরীর ভেজা। ভাবলাম এতো কষ্ট করে সুটিং করতে হয়?
খাবারে এলো। সবার সঙ্গে আমিও বসে খাচ্ছি। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ—তবুও মনে হচ্ছিল আমি এই জগতেরই একজন।
ঠিক তখনই সেটে এলেন বিখ্যাত প্রযোজক শহিদুল হক শিকদার।
তিনি আমার আত্মীয়—সম্পর্কে খালু।
আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“শুনলাম তুই সিনেমায় কাজ শুরু করেছিস?”
আমি মাথা নাড়লাম।
তিনি একটু হাসলেন, তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন—
“সিনেমার ডাল যার পেটে যায়, সে আর সিনেমা ছাড়তে পারে না। আজ থেকে তুই এই জগতের একজন হয়ে গেলি।”
কথাটা শুনে আমি মনে মনে হাসলাম।
ভাবলাম—আমি কোনোদিন সিনেমার ডাল খাব না।
আজ পর্যন্ত খাইনি।
তবুও তার কথাকে ভুল প্রমাণ করে, টানা ৩২ বছর ধরে আমি এই সিনেমার সঙ্গেই আছি।
পরে বুঝেছি—
“সিনেমার ডাল” আসলে কোনো খাবার না, এটা এই লাইনের এক অদৃশ্য বন্ধন। একবার ঢুকে গেলে, আর বের হওয়া যায় না।
আর আমার ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হয়েছে।
যে দিন বুঝিনি কিছুই—সেদিনই শুরু হয়েছিল সব।
চলবে…