“চিত্রালয়” আমার প্রথম প্রেম।
Published on: March 28, 2026
১.
শেষ শো: একজন প্রজেকশনিস্ট।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী, শহরের নাম ব্রাহ্মনবাড়ীয়া। সিনেমা হলের নাম চিত্রালয়। আজ আর কেউ তেমন করে এই সিনেমা হলের নাম উচ্চারণ করে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেমন পুরনো রাস্তার নাম যেমন হারিয়ে যায়, তেমনি হারিয়ে গেছে “চিত্রালয়” নামের সেই সিনেমা হলটাও।
কিন্তু আমার কাছে, সেটা শুধু একটা সিনেমা হল ছিল না— একটা প্রেম ছিলো, একটা দরজা ছিল, যেখানে ঢুকলেই অন্য একটা পৃথিবী শুরু হতো।
ছোটবেলায় যখন ক্লাশ ফোর এর ছাত্র তখন প্রথম যে দিন ওই হলে ঢুকেছিলাম, মনে আছে হলঘরটা অন্ধকারট ছিল। ভয় না, বরং অদ্ভুত একটা অনুভুতি হয়েছিলো। তখন আমি ভাবতাম নায়ক নায়িকা স্ব-শরীরে সিনেমা হলে এসে অভিনয় করে। কিন্তু যেদিন শহরের অন্য সিনেমা হল রূপশ্রী-তে ও চিত্রালয় দুই হলেই নায়ক রাজ্জাকের সিনেমা চলছিলো তখন ভুল ভাঙল। জানতে পারলাম পর্দায় আলো ফেলে সিনেমা দেখানো হয়।
প্রথম দিন হলে ঢুকে দেখি সামনে বিশাল পর্দা, আর কোথাথেকে আলো এসে সেই পর্দায় মানুষদের জীবন্ত করে তুলছে।
পরে জেনেছিছি—ওই আলোর পেছনে একজন মানুষ ছিল।একজন প্রজেকশনিস্ট। কোনোদিন তার নাম আমি জানার চেষ্টা করিনি। কিন্তু তিনি আমাকে অনেক আনন্দ দিয়েছিলেন। আমার কাছে সে ছিল শুধু “মেশিন রুমের মানুষ”।
আমি একদিন সাহস করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম। যেখানে একটা ছোট ঘর, ভেতরে বিশাল একটা মেশিন —কেমন যেন একটা শব্দ। সেই মানুষটা দাড়ানো আছে, চোখ তার সবসময় রিলের দিকে।
তিনি আমাকে ডেকে বললেন, “দেখবি?”
আমি মাথা নাড়লাম। ভেতরে ঢুকে দেখলাম কিভাবে সিনেমা প্রদর্শন হয়। দারূন অভিজ্ঞতা। কার্বন পুড়িয়ে আলো ফেলতো। সেই আলোয় পর্দা বাস্তব রূপ ধরতো।
সিনেমা প্রদর্শন শেষে প্রজেকশনিষ্ট রীল নিয়ে মেতে উঠলেন। পরিষ্কার করলেন কাটলেন জোড়া দিলেন। কিছু কাটা অংশ ফেলে দিলেন। আমি সেগুলি কুড়িয়ে দেখতে থাকলাম। ওনি বললেন নিয়ে যা। আমি খুশি হয়ে নিয়ে আসলাম। বাসায় এসে আলোয় ধরে দেখলাম একেকটা ফ্রেমে থেমে থাকা মানুষ, থেমে থাকা হাসি, থেমে থাকা কান্না। পুরো সিনেমা না, শুধু টুকরো টুকরো জীবন। গর্ব নিয়ে বন্ধুদের দেখালাম আর বন্ধু মহলে দারুন সমাদর পেলাম। সেই দিন থেকে আমার একটা নতুন নেশা শুরু হলো। সেই থেকে নতুন সিনেমা হলে আসলেই শো শেষ হলে আমি অপেক্ষা করতাম। তিনি মাঝে মাঝে ডাক দিতেন। কখনো ছোট্ট, কখনো একটু বড়—সিনেমার কাটা অংশগুলো আমাকে দিতেন।
আজকে বুঝতে পারি, আমি তখন সিনেমা দেখতাম না—আমি সিনেমা “ধরতে” শিখছিলাম। একজন প্রজেকশনিস্টের কাছ থেকে।
কষ্টের কথা বহু বছর পর যখন শুনলাম “চিত্রালয়” বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন শহরে ছিলাম না।
কিন্তু আমার মনে হয়, সেই শেষ শো-তে একটা মানুষ ঠিকই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো ছিল মেশিনের দিকে। তনি হয়তো শেষবারের মতো রিল চালিয়েছিলেন।
শেষবারের মতো আলোটা পর্দায় ফেলেছিলেন। আর হয়তো কোনদিনই রীলের অংশ কাটবেন না এবং জোড়া দিবেন না। আর আমার মতো কোন কিশোর ছেলে টুকরা অংশ পেয়ে আনন্দ পাবে না।
আজ মনে হয় জীবনও তো ঠিক সিনেমার মতো।
চলতে গেলে, এগোতে গেলে—
কিছু অংশ কেটে ফেলতেই হয়।
(চলবে…)